টেকনাফে উদ্ধার মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও সৈনিক তিতাস হত্যার বিচার দাবি
টেকনাফে উদ্ধার ৫৭ জনের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন চায় অনির্বাণ

কক্সবাজারের টেকনাফে যৌথ বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সারভাইভার-নেতৃত্বাধীন সংগঠন অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন।
একই সঙ্গে অভিযানে নিহত সেনাসদস্য সৈনিক মো. তিতাস শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং মানবপাচার চক্রের মূল হোতাদের বিচারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
আজ রোববার (৮ নভেম্বর) সংগঠনটির সভাপতি মো. আল-আমিন নয়নের স্বাক্ষরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়।
স্মারকলিপিতে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি মানবপাচার চক্রের মূল হোতা, অর্থদাতা, নিয়োগকারী, অস্ত্রের উৎস এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আইএসপিআরের ৫ নভেম্বরের বিজ্ঞপ্তির বরাতে বলা হয়, টেকনাফের রঙ্গীখালী পাহাড়ে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযানে গোলাগুলির সময় সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭) গুরুতর আহত হন। পরে রামু সিএমএইচে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ওই অভিযানে ৫৭ জনকে উদ্ধার এবং সন্দেহভাজন মানবপাচার চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছিল।
অনির্বাণের দাবি, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা, তাঁদের বর্তমান অবস্থান, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হালনাগাদ সরকারি তথ্য প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা অনুমানের ভিত্তিতে নির্ধারণ না করে প্রত্যেককে পৃথকভাবে শনাক্ত ও যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানোর আগে তাঁদের মতামত ও নিরাপত্তার ঝুঁকি মূল্যায়নের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শিশু থাকলে শিশুবান্ধব সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের শুধু উদ্ধার বা অভিবাসন পরিস্থিতির কারণে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তাঁদের ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত করে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়াকে কোনো ধরনের সহায়তা পাওয়ার শর্ত করা যাবে না।
পাশাপাশি মানবপাচারপ্রবণ পাহাড়ি এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল, নৌপথ ও সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
স্মারকলিপির অনুলিপি জাতীয় মানবপাচার দমন সংস্থার চেয়ারম্যান, পুলিশ মহাপরিদর্শক, সিআইডি প্রধান, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
এতে পত্রপ্রাপ্তির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে একজন যোগাযোগ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সারভাইভার সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণে জরুরি সমন্বয় সভা আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. আল-আমিন নয়ন বলেন, “উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়াই দায়িত্বের শেষ নয়। উদ্ধার হওয়া প্রত্যেক মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, চিকিৎসা, ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সৈনিক তিতাস শেখের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং এই অপরাধের পেছনে থাকা পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণ কাজে লাগিয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বেচ্ছাসম্মতির ভিত্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা, সেবার সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং পুনর্বাসন-পরবর্তী যোগাযোগে সহায়তা করতে আগ্রহী অনির্বাণ।
উল্লেখ্য, অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন একটি সারভাইভার-নেতৃত্বাধীন সংগঠন। মানবপাচার ও মানব চোরাচালান প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিরাপদ অভিবাসন এবং নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে কাজ করছে সংগঠনটি।



